গ্রামের সেই ভয়ানক ভাইরাল রাস্তা : সুকান্তপুরের রহস্য`

 গ্রামের সেই ভয়ানক ভাইরাল রাস্তা


সুকান্তপুর গ্রাম। একসময় ছিল শান্ত, নিরিবিলি। এখন রাত নামলেই চারপাশে শুধু ফোনের আলো, লাইভ স্ট্রিম, আর দর্শকদের চিৎকার। গ্রামের পচা-পানা রাস্তাটা এখন ‘ভাইরাল রাস্তা’ নামে বিখ্যাত।


কী ছিল সেখানে? শুরুটা হয়েছিল তিন বছর আগে। স্কুলশিক্ষক অরুণ সাহা রাতে গ্রামের মোড়ে দাঁড়িয়ে একটি ফেসবুক লাইভ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ ক্যামেরায় ধরা পড়ল—এক নিমিষে তাঁর পেছনের রাস্তাটা চিকচিক করে উঠল, যেন সাদা আলোর শিরা বেয়ে যাচ্ছে। দর্শক হাজার ছাড়াল। কেউ বলল ভুতুড়ে ঘটনা, কেউ বলল বৈজ্ঞানিক ব্যাপার।


কিন্তু এর পর থেকেই শুরু। রাত নেমে ওই রাস্তা পার হতে গেলে ফোনে ভিডিও রেকর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যেত। যার স্মৃতিতে কোনো পুরনো আঘাত ছিল, সে এলে ক্যামেরায় ভেসে উঠত সে আঘাত—আসল না ভূত, কেউ বলতে পারত না।


গল্পটা জানতে চান? ঠিক আছে, শোনো।;;;;;


তখন শহরের এক ট্রাভেল ব্লগার মাধবী সোম। তার সাবস্ক্রাইবার চার লাখ। সে শুনল ‘ভাইরাল রাস্তা’ রহস্য। যেতে রাজি হলো এক দল সাংবাদিক আর প্যারাসাইকোলজিস্ট নিয়ে। পৌঁছুল রাত এগারোটায়। গোটা গ্রাম আলো ঝলমল—দূর থেকে মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, নাশতার স্টল। গ্রামের কৃষক রমেশচন্দ্র বললেন, “এখন আর শান্তিতে ঘুমাতে পারি না। পর্যটক এসে রাস্তায় ডিবি পুঁতে দেয়, ভূত তাড়ানোর নামে।”


মাধবী হেসে বলল, “আমি আসলে সত্যি দেখতে চাই।”


তিনি একা রাস্তায় পা রাখলেন। সঙ্গে সাংবাদিক মিলন। পা ফেলতেই মাধবীর ক্যামেরা অন হয়ে গেল। ভিডিওতে প্রথমে কিছু দেখা গেল না, তারপর হঠাৎ ফ্রেমে ভেসে উঠল একটি ছোট মেয়ে। মেয়েটি চিৎকার করে বলল, “মা, পুড়ছি!”—আর অদৃশ্য।


মাধবী কাঁপলেন। মিলন তবু থামল না। সে সামনে এগোতেই তার ফোনে দেখা গেল প্রায় দশ বছরের পুরনো সংবাদ: ওই গ্রামে এক রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গিয়েছিল তিন বছর বয়সী তিথি। সেই রাস্তা দিয়েই লাশ সরানো হয়েছিল।


ব্যস। ঘটনা ভাইরাল হয়ে গেল। পরের দিন হাজার হাজার মানুষ এলো। কেউ এনে পুজো দিল, কেউ ফটো তুলল। কিন্তু কে জানে, প্রতিবার রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার আলোর রং বদলায়—লাল, নীল, সাদা। আর ভিডিওতে কখনো তিথি, কখনো অজানা মানুষ।


তারপর এলো এক রাত। সেদিন সত্যিই কিছু অন্যরকম ঘটল। কয়েকজন স্থানীয় যুবক মিলে মদ খেয়ে রাস্তার মাথায় ‘গেম অব থ্রোনস’ স্টাইলের ছবি তুলতে গিয়ে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ল। তাদের ফোনে পাওয়া গেল অস্পষ্ট কান্না। বিশেষজ্ঞরা বললেন, এটা ‘প্লেস মেমরি’—কোনো জায়গায় অতীতের ট্রমা এম্বেড হয়ে গেলে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড ধারণ করে।


কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধা সরস্বতীঠাকুরুন বললেন অন্য কথা। “রাস্তাটা পায়ে হেঁটে যারা আসত অকালে মরে, তাদের কথা রেখে গেছে মাটি। এখন ওরা যেন ওই ভিডিওর মাধ্যমে মেলামেশা চায়।”


গল্প আরও ঘনাল। একদিন নিজের অজান্তে আমি ওই রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। আমার ফোনে হুট করে ভেসে উঠল আমার বাবার সেই দিনের ভিডিও—যেদিন তিনি হাসপাতালে শেষ শ্বাস নিয়েছিলেন। আমি কেঁদে ফেললাম। অমনি রাস্তা থেকে বাতাস বেরুল, হালকা ধুলোয় লেখা যেন ‘ক্ষমা চাই’।


ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখলাম গোটা রাস্তাটাই ভেসে গেছে। কালবৈশাখী ঝড়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে, যেন কাউকে আর কষ্ট দেবে না। গ্রামের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।


ওই রাস্তার শেষ ভিডিওটি কেবলমাত্র আমার ফোনে রয়ে গেছে। যেখানে তিথির ছায়া একবার হেসে বলেছিল, “খুঁজতে এসো না আর। আমাদের ভয়ানক রাস্তা ভাইরাল হয়েছিল কেবল স্মৃতি জাগানোর জন্য। এখন আমরা মুক্তি চাই।”


আমি আর কখনো সেটা দেখাইনি। দিনের আলোয় সুকান্তপুর আবার শান্ত। শুধু যখনই কেউ স্মৃতির যন্ত্রণার কথা বলে, মনে হয়—হয়তো সেই রাস্তা অদৃশ্য হয়ে গেছে, কিন্তু অন্য রাস্তা তো আছে, আছেই। আর মানুষ সেখানে ফোন হাতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যন্ত্রণা কিনতে। কে বলবে, সাবধান?


গ্রামের সেই ভয়ানক ভাইরাল রাস্তা শুধু ছিল প্রযুক্তি আর অতীতের সেই মর্মভেদী ঠিকানায় সাক্ষাৎ—যেখানে আমরা দেখতে চাই না তাও দেখে ফেলি।       



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চারুলতার জীবনের ভয়ানক এক রাত

মরুভূমির বিয়ের রাত