মরুভূমির বিয়ের রাত
আমি রুবাইয়া। দুবাইয়ে জন্ম, বড় হয়েছি শারজার একটা ছোট ফ্ল্যাটে। মা মারা যাওয়ার পর বাবা বলত, “তোর গলায় আল্লাহর নেয়ামত আছে মা।” সেই নেয়ামতই আমাকে টেনে নিয়ে গেল মরুভূমির সবচেয়ে ভয়ংকর রাতে।
আমি প্রফেশনে _টাগ্গাকা_। গালফের ধনী আরব পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে গান গাই। মুখ দেখানো মানা, তাই শুধু আওয়াজ যায় মজলিসে। রাত ১টায় ফোনটা বাজল। অচেনা নাম্বার।
“রুবাইয়া? আমি আমিরা। আগামীকাল রাতে একটা ছোট আয়োজন আছে। আল-মাহা মরুভূমির কাছে, পুরোনো দাদার খামারবাড়িতে। পেমেন্ট ডবল দেব। শুধু তুমি আর তোমার দুইজন ব্যান্ডমেট আসবে। কাউকে বলো না।”
কণ্ঠটা খুব নরম, কিন্তু কেমন যেন ধাতব। আমি না করতেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু ভাড়ার চিন্তা, অসুস্থ বাবার ওষুধের টাকা… আমি হ্যাঁ বলে দিলাম।
পরদিন সন্ধ্যা ৮টা। আমরা তিনজন একটা সাদা ভ্যানে রওনা হলাম। ড্রাইভার কথা বলে না। গাড়ি যত মরুভূমির ভেতরে ঢোকে, মোবাইলের নেটওয়ার্ক মরে যায়। ৪০ মিনিট পর একটা বিশাল সাদা ম্যানশন দেখা গেল। চারদিকে খেজুর গাছ, মাঝে কৃত্রিম ঝরনা। কিন্তু আশ্চর্য, বাইরে একটাও গাড়ি নেই।
দরজা খুলল এক বুড়ি। মুখে নিকাব, চোখ দুটো অসম্ভব কালো। “দেরি করলে বর রেগে যায়,” শুধু এইটুকু বলল।
ভেতরে ঢুকতেই মনে হল অন্য দুনিয়ায় চলে এসেছি। সোনার ঝাড়বাতি, মেঝেতে পার্সিয়ান কার্পেট, বাতাসে উদ আর জাফরানের গন্ধ। ৫০-৬০ জন মেহমান। সবাই লম্বা কাফতানে, মুখ ঢাকা। হাসছে, কথা বলছে, কিন্তু আওয়াজ নেই। ঠোঁট নড়ে, কিন্তু শব্দ আসে দূর থেকে, যেন কূপের তলা থেকে ভেসে আসছে।
আমার ব্যান্ডমেট লাইলা আমার হাত চেপে ধরল। “রুবাইয়া, ওদের জুতো দেখেছো?”
দেখলাম। লম্বা জামার নিচ দিয়ে মাঝে মাঝে পা দেখা যাচ্ছে। কারো পা নেই। কারো পায়ের জায়গায় ছাগলের খুর। কারো পা উল্টো দিকে বাঁকা। এক মহিলা নাচতে নাচতে ঘুরল, তার পায়ের গোড়ালি থেকে রক্ত গড়াচ্ছে, কিন্তু সে হাসছে।
আমার গলা শুকিয়ে গেল। কিন্তু স্টেজে উঠতে হল। বর-কনে আসবে।
ড্রাম বাজল। আমি শুরু করলাম পুরোনো নাবাতি গান—“ইয়া লেইল, ইয়া আইন…”
গাইতে গাইতে দেখলাম বর-কনে আসছে। কিন্তু ওরা স্টেজে উঠল না। ওদের বসানো হলের একদম শেষে, যেখানে একটা বিশাল পাথরের মূর্তি। মূর্তিটা একটা নেকড়ের মতো, মুখ হা করা। বর-কনেকে বসানো হল সেই হা করা মুখের ভেতরে, দাঁতের মাঝখানে।
আমার হাত কাঁপছে। গান থামাতে চাই, কিন্তু গলা থামে না। যেন কেউ আমার স্বরযন্ত্র ধরে গাইয়ে নিচ্ছে। লাইলা ফিসফিস করে বলল, “এরা মানুষ না। চলে যাই।”
ঠিক তখনই বাতি নিভে গেল।
অন্ধকারে শুধু শোনা গেল হাসি। শত শত মানুষের হাসি, কিন্তু সব হাসি একসাথে, একটাই কণ্ঠের মতো। তারপর একটা ভারী আওয়াজ—যেন পাথর ঘষা হচ্ছে। নেকড়ের মূর্তির মুখটা ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে।
“দৌড়াও!” চিৎকার করে উঠলাম।
আমরা তিনজন অন্ধকারে দৌড় দিলাম। পেছনে শোনা যাচ্ছে মাংস ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দ, হাড় মটমট করার শব্দ। দরজা খুঁজে পেলাম, বাইরে বেরিয়ে দেখি ম্যানশন নেই। সামনে শুধু মরুভূমি। কোথায় ঝরনা, কোথায় আলো? সকালে যে রাস্তা দিয়ে এসেছি, সেটাও নেই।
আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে পড়ে গেলাম। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন ফজরের আযান হচ্ছে। দূরে একটা মসজিদের মিনার দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের গাড়ি নেই, যন্ত্রপাতি নেই। শুধু আমার হাতে একটা কালো পাথরের আংটি। আংটির ভেতরে খোদাই করা—“আমিরা।”
আমি আংটিটা ফেলে দিলাম। বালিতে পড়তেই সেটা গলে গেল, যেন মোম।
বাড়ি ফিরে আমি পুলিশে গেলাম। বললাম, “আল-মাহা মরুভূমির কাছে একটা ম্যানশনে জিনের বিয়ে দেখেছি।”
পুলিশ অফিসার হাসল। “ম্যাডাম, ওই জায়গায় ১৯৮৫ সাল থেকে কেউ থাকে না। ৮৭ সালে পুরো পরিবার বালির ঝড়ে মারা যায়। ম্যানশনটা বালির নিচে চাপা পড়ে গেছে।”
আমি গুগল ম্যাপ খুললাম। ওই লোকেশনে এখন শুধু ধূ ধূ বালি। কোনো রাস্তা নেই।
তারপর থেকে প্রতি শুক্রবার রাতে আমি ঘুমাতে পারি না। স্বপ্নে দেখি সেই নেকড়ের মুখটা ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে। কেউ ফিসফিস করে বলে, “তুমি আমাদের গান শুনিয়েছো। এবার তোমার পালা।”
আমি গান ছেড়ে দিয়েছি। বাবাকে বলেছি, গলায় সমস্যা হয়েছে। মিথ্যা। গলায় কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হল, আমি ভয় পাই। যদি আবার গাই, তাহলে ওরা আবার ডাকবে।
গতকাল রাতে আমার ফোনে একটা মেসেজ এল। অচেনা নাম্বার। শুধু লেখা:
“আগামী বৃহস্পতিবার। আবার ছোট আয়োজন আছে। পেমেন্ট ট্রিপল। কাউকে বলো না, রুবাইয়া।”
নিচে একটা ছবি। মরুভূমির মাঝে সেই সাদা ম্যানশন। ঝলমল করছে।
আমি ফোনটা ভেঙে ফেলেছি। কিন্তু আমার কানে এখনো সেই ধাতব কণ্ঠটা বাজে—
“কাউকে বলো না।”
---
*শেষ*

মন্তব্যসমূহ