*বট গাছের পেত্নী*


আমাদের গ্রামের শেষ মাথায় একটা ২০০ বছরের পুরনো বটগাছ ছিল। দিনের বেলায় ছেলেরা ওটার নিচে ক্রিকেট খেলতো, বুড়োরা তাস পিটাতো। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই জায়গাটা শ্মশান হয়ে যেত। দাদির মুখে শুনতাম, ওই গাছে নাকি এক পেতনি থাকে। তার নাম ছিল রাধা।


ব্রিটিশ আমলে রাধার বিয়ে ঠিক হয়েছিল পাশের গ্রামের জমিদার বাড়ির ছেলের সাথে। বিয়ের দিন সন্ধ্যায় গায়ে হলুদের তত্ত্ব আসার কথা। রাধা নতুন লাল শাড়ি পরে, চোখে কাজল দিয়ে পুকুর ঘাটে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু তত্ত্ব আর আসেনি। খবর এলো, জমিদারের ছেলে অন্য এক মেয়েকে নিয়ে কোলকাতা পালিয়েছে। 


অপমানে, কষ্টে রাধা ওই রাতেই বটগাছের ডালে নিজের লাল ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ে। গ্রামের লোক সকালে তার নিথর দেহ নামায়। সেই থেকে নাকি প্রতি অমাবস্যার রাতে রাধাকে বটগাছের মগডালে বসে থাকতে দেখা যায়। পা দোলায় আর ফুঁপিয়ে কাঁদে। অনেকেই শুনেছে তার চাপা কান্না।


আমার বয়স তখন ২০ বছর । দলের সবচেয়ে সাহসী ছিলাম আমি, এবং অনেক বুদ্ধিমান ও ছিলাম, হাসান। বন্ধুরা চ্যালেঞ্জ দিলো, "তুই যদি অমাবস্যার রাতে বটগাছের গোড়ায় একটা লোহার পেরেক গেঁথে আসতে পারিস, তোকে ২০০০ টাকা দেব।" টাকার লোভ আর নিজেকে হিরো প্রমাণের নেশা। রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি আমার জন্য কত বড় ভয়ানক বিপদ এগিয়ে আসছে।


সেদিন ছিল কালীপূজার অমাবস্যা। রাত ২ টায় হাতে একটা হাতুড়ি আর পেরেক নিয়ে বের হলাম। গ্রাম নিঃস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া কোনো শব্দ নেই। বটগাছের কাছে যেতেই হঠাৎ কেমন একটা হিমেল বাতাস গা ছুঁয়ে গেল। গাছের পাতাগুলো অকারণে সরসর করে উঠলো। 


বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলেও সাহস দেখিয়ে গাছের গোড়ায় বসে পড়লাম। পেরেকটা মাটিতে রেখে যেই হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিতে যাব, ঠিক তখনই মাথার উপর থেকে খিলখিল করে হাসির শব্দ ভেসে এলো। চমকে উপরে তাকিয়ে দেখি, একটা আবছা সাদা শাড়ি পরা মেয়ে ডালে পা দুলিয়ে বসে আছে। চুলগুলো মুখের উপর এসে পড়েছে, শুধু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।


গলা শুকিয়ে কাঠ। হাত থেকে হাতুড়ি পড়ে গেল। পেত্নীটা ফিসফিস করে বলল, "কিরে হাসান, আমাকেও পেরেক দিয়ে গাছের সাথে গেঁথে রাখবি? যেমন ওই জমিদারের ছেলে আমার জীবনটা গেঁথে দিয়েছিল?"


আমার নাম জানলো কীভাবে! আমি আর দাঁড়াতে পারলাম না। উঠে দৌড় দিতে গিয়ে নিজের পাঞ্জাবির কোণা পেরেকের সাথে আটকে গেল। মনে হলো পেতনিটা আমাকে টেনে ধরেছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম, "মাফ করে দাও! আমি কিছু করিনি!"


তখনই মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো। "আল্লাহু আকবার..." শব্দটা কানে যেতেই বটগাছের মগডাল থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চোখের পলকে সাদা শাড়িটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমি দেখলাম, গাছের গোড়ায় কোনো পেরেক নেই। আমার পাঞ্জাবিটা গাছের একটা শুকনো শিকড়ের সাথে আটকে ছিল।


সেই রাতের পর থেকে আমি আর কোনোদিন সন্ধ্যার পর ওই বটগাছের ধারেও যাইনি। বন্ধুরা টাকা দিতে চেয়েছিল, আমি নেইনি। কারণ আমি বুঝে গেছি, কিছু জিনিসের দাম টাকা দিয়ে হয় না। রাধার কষ্টটা আমি এক রাতের জন্য হলেও অনুভব করেছিলাম। 


এখনো অমাবস্যার রাতে ওই পথ দিয়ে গেলে বটগাছের দিক থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। গ্রামের বৃদ্ধরা বলে, রাধা এখনো তার জমিদার বরের অপেক্ষায় আছে। কেউ ভালোবেসে প্রতারিত হলে রাধা তাকে দেখা দেয়, সাবধান করে দেয়।      

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চারুলতার জীবনের ভয়ানক এক রাত

মরুভূমির বিয়ের রাত