চারুলতার জীবনের ভয়ানক এক রাত

 চারুলতার জীবনের ভয়ানক এক রাত

Hasan__26

চারুলতা চৌধুরী। নামটার মতোই মিষ্টি ও কোমল স্বভাবের মানুষ তিনি। বয়স আটাশ, স্বামী প্রবীণ চৌধুরী কলকাতার বড় এক কোম্পানির কর্মকর্তা। চারুলতার দিনগুলো কেটে যায় ঘর গুছিয়ে, গান শুনে, বই পড়ে। কিন্তু তার জীবনে ছিল এক ভয়ানক রাত—যে রাতে তার সব বিশ্বাস, ভালোবাসা, নিরাপত্তার বেড়াজাল এক নিমেষে ধুলিসাৎ হয়ে যায়।


বর্ষাকাল। জানলা দিয়ে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। চারুলতা একা। স্বামী প্রবীণ অফিসের কাজে দিল্লি গেছেন চারদিনের জন্য। আজ তৃতীয় রাত। আগের দুই রাত কেটেছে স্বাভাবিক। কিন্তু আজ বিকেল থেকেই তার মনে অদ্ভুত এক অস্বস্তি। বাইরে বৃষ্টি বেড়ে যায়। সন্ধ্যার পর থেকে শহরে লোডশেডিং। মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘরের কোণে বসে তিনি উপন্যাস পড়ছেন।


রাত সাড়ে আটটা। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। চমকে ওঠেন চারুলতা। এই রাতে কে? ভৃত্য লক্ষ্মীর আজ ছুটি। পাড়ার পরিচিত কেউ? দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেন—চারজন লোক। তিনজন পুরুষ, একজন মহিলা। মহিলাটি কাঁদছে।


চারুলতা দরজা খুলতেই একজন বললেন, "ম্যাডাম, আমরা পুলিশ থেকে আসছি। আপনার স্বামী শ্রী প্রবীণ চৌধুরী।"


চারুলতার বুকে ধড়ফড়। "কী হয়েছে?"


পুলিশ অফিসার বললেন, "আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। এক নারী নির্যাতনের মামলা। দিল্লি থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা এসেছে। আমরা তাঁকে খুঁজছি। তিনি এখানে আছেন?"


চারুলতা অবাক। "তিনি তো দিল্লি গেছেন।"


"সে তথ্য আমাদের জানা আছে। কিন্তু তিনি দিল্লি থেকে ফেরার কথা আজই। আমরা জানতে পেরেছি তিনি ফিরেছেন।"


পুলিশ বিনা অনুমতিতে ঘরে ঢুকে পড়ে। ঘর তল্লাশি শুরু করে। চারুলতা দিশেহারা। কী হচ্ছে? তার স্বামী? নির্যাতন?


হঠাৎ পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকে স্বামী প্রবীণ। চারুলতা স্বস্তি পান—প্রবীণ এগিয়ে এসে পুলিশ অফিসারের হাত ধরে বলেন, "আমি ওঁদের সঙ্গে যাচ্ছি। তুমি ভয় পেয়ো না। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।"


যাওয়ার আগে ওই মহিলাটি চারুলতার দিকে তাকিয়ে বলে, "আপনি বেচারা। ধোঁকায় আছেন। আপনার স্বামী আমার বোনকে ধর্ষণ করেছেন। বোন এখন হাসপাতালে। তার বয়স মাত্র উনিশ।"


পুলিশ প্রবীণকে নিয়ে যায়। সমস্ত পাড়া জেগে ওঠে। প্রতিবেশীরা চারুলতার ঘরে জড়ো হয়। কেউ জল দেয়, কেউ সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু চারুলতা যেন বোবা। কিছুই বলতে পারছেন না।


মধ্যরাত। সবাই ফিরে যায়। আবার একা। মোমবাতি নিভে এসেছে। অন্ধকারে চারুলতা বসে থাকে। মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তার স্বামী—যাকে তিনি ভালোবাসতেন, ভরসা করতেন—তিনি কী এমন করতে পারেন?


সকাল হয়ে যায়। চারুলতা কখনো কাঁদতে বসেন, কখনো জানলার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভারতে দিল্লি থেকে ফোন আসে। খবর—প্রবীণ চৌধুরীকে জামিন দেওয়া হয়নি, তিহার জেলে পাঠানো হয়েছে। মামলার সাক্ষী আছে, চিকিৎসা রিপোর্ট আছে।


দিন সাতেক পর চারুলতা নিজে দিল্লি যান। উকিলের সঙ্গে দেখা করেন। সেই উকিল তাঁকে মামলার কাগজপত্র দেখান। যেখানে স্পষ্ট প্রমাণ—প্রবীণ চৌধুরী দিল্লিতে অফিসের ছুতোয় এক যুবতীকে পার্টিতে ডেকে এনে মাদক মিশিয়ে নির্যাতন করেন। যুবতী বাঁচতে পেরেছে অলৌকিকভাবে।


চারুলতা হাসপাতালে ওই যুবতীকে দেখতে যান। যুবতীর মুখ দেখে চারুলতা চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। কারণ ওই মেয়েটির বয়সী তার ছোট বোন থাকলে আজ এমনই হতো।


তখন ভোর তিনটে। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারুলতা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকেন। সেই বৃষ্টি, যে রাতের সেই বৃষ্টি—ঠিক একই রকম। তিনি বোঝেন তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক রাত কেবল সেই রাতটিই নয়, বরং প্রতিটি রাতই এখন ভয়ানক, কারণ তার স্বামী আসলে কী ছিলেন, সেটা জানার পর তার আর ঘুম আসে না।


ছয় মাস পর চারুলতা কলকাতায় ফিরে প্রবীণের কাছ থেকে ডিভোর্স নিয়ে নেন। বিচারে প্রবীণের দশ বছরের সাজা হয়। চারুলতা এখন একটি এনজিওতে কাজ করেন, নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়ান। সেই ভয়ানক রাত তাকে ভাঙেনি, বরং গড়ে দিয়েছে।


শেষ রাতে তিনি ডায়েরিতে লেখেন—'সেই রাতে আমি মরিনি, আমি জন্মেছি।'


[সমাপ্ত]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মরুভূমির বিয়ের রাত