রামিসা এখন আকাশের তারা*
রামিসা এখন আকাশের তারা*
স্কুলের ব্যাগটা তখনো নতুন। মায়ের হাতে সেলাই করা লাল ফিতেটা এক কোণে একটু ছিঁড়ে গিয়েছিল। রামিসা বলেছিল, “আম্মু, কাল স্কুলে গিয়ে স্যারকে দেখাবো। বলবো আমার মা নিজে বেঁধে দিয়েছে।”
সাত বছরের মেয়েটার চোখে তখন সারাদিনের স্বপ্ন। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় সে অংকে ১০০ পাবে। পেলে মা তাকে আইসক্রিম কিনে দেবে। পল্লবীর ছোট্ট বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে গুনছিল কতদিন বাকি।
মঙ্গলবার সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। মা চুল বেঁধে দিল, বাবা পকেটে দুটো টাকা গুঁজে দিল। “সাবধানে যাস মা।” রামিসা হাসি দিয়ে দরজার বাইরে পা রাখল। স্কুল মাত্র দুই মিনিটের রাস্তা।
কিন্তু সে স্কুলে পৌঁছায়নি।
মা যখন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে আসা বাচ্চাদের ভিড়ে রামিসাকে খুঁজে পেল না, তখন তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। পুরো গলি তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর, প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটের দরজার সামনে সে থমকে দাঁড়াল। রামিসার ছোট্ট স্যান্ডেলটা দরজার বাইরে পড়ে আছে। ধুলোয় মাখা।
তারপর আর কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে, পুলিশ এসেছিল। দরজা ভেঙেছিল। খাটের নিচ থেকে একটা ছোট্ট শরীর বেরিয়ে এলো। মাথা নেই। মাথাটা পাওয়া গেল বাথরুমে।
পল্লবীর আকাশ সেদিন ভারী হয়ে গিয়েছিল। যে বাচ্চারা সকালে “রামিসা আপু” বলে ডাকত, তারা রাতে ঘুমাতে পারেনি। যে মায়েরা সন্তানকে স্কুলে পাঠায়, তারা দরজায় খিল এঁটে সারাত জেগে ছিল।
রামিসা আর কখনো আইসক্রিম খায়নি। আর কখনো স্যারকে তার ব্যাগের ছেঁড়া ফিতেটা দেখায়নি। সে শুধু চলে গেল, এমন এক জায়গায় যেখানে কেউ আর তাকে কষ্ট দিতে পারবে না।
আজ রাতে যদি তুমি আকাশের দিকে তাকাও, দেখবে ছোট্ট একটা তারা একটু বেশি জ্বলজ্বল করছে। ওটা রামিসা।
সে এখন আর কারো ফ্ল্যাটের খাটের নিচে নেই। সে এখন আকাশে।
যেখানে কোনো দরজা বন্ধ হয় না।
যেখানে মা ডাকলে কেউ হারিয়ে যায় না।
যেখানে সাত বছরের বাচ্চাদের শুধু হাসতে হয়।
মা এখনো রাতে বারান্দায় দাঁড়ায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে, “পড়া হয়েছে মা? ঠান্ডা লাগছে না তো?”
আকাশ থেকে বাতাসের একটা শীতল স্পর্শ এসে গায়ে লাগে। মা জানে, রামিসা উত্তর দিয়েছে।
---
রামিসারা মরে না। ওরা তারা হয়ে যায়।
আর আমরা নিচে থেকে তাকিয়ে থাকি, চোখের জলে।

মন্তব্যসমূহ