কুমিল্লা, বুড়িচংয়ের শ্বেত পাগলা //

 বুড়িচংয়ের শ্বেত পাগলা


কাল ছিল বৈশাখের ২৭ তারিখ। কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার রামনগর গ্রামে আজও কেউ সন্ধ্যার পর গোমতী নদীর পুরনো বাঁধের দিকে যায় না। যারা গেছে, ফেরেনি। যারা ফিরেছে, তারা আর কথা বলে না।

আমি রাকিব। ঢাকায় সাংবাদিকতা করি। তিন মাস আগে আমার দাদা মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে তিনি শুধু একটা কথা বলেছিলেন, "রাকিব, দাদার বাড়ির পেছনের বটগাছটা কেটো না। ওখানে আমি বাঁচিয়ে রেখেছি তোদের।"


দাদার বাড়ি রামনগরে। কুমিল্লা শহর থেকে সিএনজিতে ৪৫ মিনিট। ছোটবেলায় প্রতি ঈদে যেতাম। তখনও গ্রামটা শান্ত ছিল। এখন শুনি রাতে কুকুরগুলো একসাথে ডেকে ওঠে, তারপর হঠাৎ চুপ। যেন কেউ ওদের মুখ চেপে ধরে।


দাদার মৃত্যুর পর জমি-জমার ভাগবাটোয়ারা করতে আমাকে যেতেই হলো। মা বললেন, "যাস না বাবা। তোর দাদা মরার আগে তিন রাত ঘুমায়নি। বলতো, ও আসতেছে।"


কে আসতেছে জিজ্ঞেস করলে বলতেন না। শুধু তাকিয়ে থাকতেন গোমতীর দিকে।


বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে গেলাম রামনগর। বাড়িটা আগের মতোই আছে। টিনের চাল, মাটির দেয়াল। পেছনে সেই বুড়ো বটগাছ। গাছের গুঁড়ি এত মোটা যে পাঁচজন ধরে ঘিরতে হয়।


চাচা বললেন, "গাছটা কাটতে হবে রাকিব। শিকড় বাড়ির বেড়া ফাটিয়ে দিচ্ছে। কন্ট্রাক্টর এনেছি কাল সকালে।"


আমি কিছু বললাম না। রাতে ঘুম হলো না। দাদার ঘরটা এখনো তালা বন্ধ। চাবিটা মায়ের কাছে ছিল। রাত ১২টার দিকে হঠাৎ ঘরের বাইরে ঠকঠক শব্দ।


দরজা খুলে দেখি কেউ নেই। শুধু বটগাছের দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে। বাতাসের সাথে ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। বাচ্চা ছেলের কান্না।


পরদিন সকালে কন্ট্রাক্টর এলো। চেইনসো নিয়ে বটগাছের গোড়ায় দাঁড়াতেই গাছ থেকে একটা কালো বিড়াল লাফিয়ে পড়লো। চোখ দুটো লাল। বিড়ালটা কন্ট্রাক্টরের পায়ে কামড় দিয়ে জঙ্গলের দিকে দৌড় দিলো।


লোকটা বললো, "আজকে হবে না ভাই। এই গাছে জ্বীন আছে।"


চাচা রেগে গেলেন। "জ্বীন-ভূত কিছু নাই। কুসংস্কার।"


কিন্তু বিকালে খবর এলো কন্ট্রাক্টর হাসপাতালে। তার সারা শরীরে নাকি কাঁটার দাগ। যেন কেউ নখ দিয়ে আঁচড়েছে।


সেদিন রাতে আমি দাদার ঘরের তালা ভাঙলাম। ভেতরে ধুলো জমে আছে। একটা পুরনো কাঠের বাক্স। বাক্সের ভেতর দাদার ডায়েরি।


১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর। পাকিস্তানি আর্মি রামনগরে ঢুকেছে। গ্রামের ১২ জন ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে গোমতীর বাঁধে। গুলি করে লাশ ফেলে দিয়েছে নদীতে।


দাদা লিখেছেন, "ওদের মধ্যে ছিল আমার ছোট ভাই রাশেদ। বয়স ১৬। ওকে মারার আগে মিলিটারি বলেছিল, তোদের নাম বল। রাশেদ কিছু বলেনি। শুধু বলেছিল, আমি বাঙালি।


আমি লুকিয়ে দেখছিলাম। কিছু করতে পারিনি। সেই রাত থেকে গোমতীর পানি লাল। গ্রামের মানুষ বলে, রাশেদ আর ওর সাথীরা ফিরে আসে। প্রতি বৈশাখে।"


শেষ পাতায় লেখা, "আমি বটগাছের নিচে ওদের শরীর পুঁতেছি। যাতে ওরা শান্তি পায়। কেউ যেন গাছটা না কাটে। কাটলে ওরা জেগে উঠবে। আর প্রথমে আসবে আমার কাছে। কারণ আমি দেখেও চুপ ছিলাম।"


ডায়েরিটা পড়ে হাত কাঁপছিল। রাত তখন ২টা। বাইরে আবার কান্নার শব্দ। এবার মনে হলো শব্দটা বটগাছের ভেতর থেকে আসছে।


পরদিন ভোরে গ্রামের মসজিদের ইমাম হুজুর এলেন। নাম হাফেজ সাহেব। বয়স ৭০ এর উপর।


তিনি বললেন, "রাকিব বাবা, তুমি শহরের ছেলে। এসব বিশ্বাস করবে না। কিন্তু শোনো। ৭১ এর পর থেকে প্রতি বৈশাখে গোমতীর বাঁধে একটা ছায়া দেখা যায়। লম্বা, সাদা কাপড় পরা। গ্রামের লোকে বলে শ্বেত পাগলা।


ও হাঁটে না। ভেসে ভেসে আসে। যাকে দেখে, তার গলা শুকিয়ে যায়। কথা বলতে পারে না। তিন দিনের মাথায় মারা যায়।


তোমার দাদা ৫০ বছর ওকে আটকে রেখেছে এই বটগাছ দিয়ে। গাছটা কাটলে ও মুক্তি পাবে।"


আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কিন্তু হুজুর, মুক্তি পেলে সমস্যা কি? ওরা তো শহীদ।"


হুজুরের মুখ কালো হয়ে গেল। "শহীদ রাগ করে না রাকিব। ওরা শান্তি চায়। কিন্তু ১২ জনের মধ্যে একজন ছিল না। একজন ছিল রাজাকার। ও মরার সময় সবাইকে অভিশাপ দিয়ে গেছে। ওই অভিশাপটাই এখন শ্বেত পাগলা।"


সেদিন দুপুরে আমি গেলাম গোমতীর বাঁধে। জায়গাটা নির্জন। চারদিকে কাশবন। বাঁধের গায়ে এখনো গুলির দাগ। পানির রং কেমন যেন লালচে।


হঠাৎ পেছন থেকে একটা গলা শুনলাম, "তুই কে রে?"


ঘুরে দেখি ১২-১৩ বছরের একটা ছেলে। গায়ে ছেঁড়া পাঞ্জাবি। চোখে ভয়।


আমি বললাম, "আমি রাকিব। তুমি কে?"


ছেলেটা হাসলো। "আমি রাশেদ। তোমার দাদার ভাই।"


আমার পা অবশ হয়ে গেল। "তুমি... তুমি তো মারা গেছো ৫৪ বছর আগে।"


রাশেদ বললো, "মরি নাই। ওরা আমাকে মারতে পারেনি। ওরা মেরেছে ওকে।" ও আঙুল দিয়ে দেখালো কাশবনের ভেতর।


সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা ছায়া। লম্বা। সাদা কাফনের কাপড়। মুখ নেই। শুধু দুটো কালো গর্ত।


রাশেদ ফিসফিস করে বললো, "ওর নাম আবদুল। আমাদের গ্রামের ছেলে। মিলিটারির দাল ছিল। ও আমাদের ধরিয়ে দিয়েছিল। মরার আগে ও বলেছিল, আমি ফিরবো। সবাইকে নিয়ে যাবো।


৫০ বছর ধরে তোমার দাদা ওকে বটগাছের নিচে চেপে রেখেছিল। গাছটা কাটলে ও বের হবে। আর প্রথমে নেবে তোমার দাদার রক্ত।"


আমি দৌড় দিলাম। পেছনে শুনলাম একটা অমানুষিক চিৎকার। যেন হাজারটা কুকুর একসাথে চিৎকার করছে।


সেদিন রাতে গ্রামে কারেন্ট গেল। রাত ১টার দিকে বটগাছটা দুলতে লাগলো। বাতাস নেই, অথচ গাছের পাতা ঝরে পড়ছে।


চাচা চিৎকার করে বললেন, "গাছ কাটো! গাছ কাটো!"


কিন্তু কেউ এগোলো না। সবাই দেখছে।


বটগাছের গুঁড়ি ফেটে গেল। ভেতর থেকে বের হলো সাদা কাপড় পরা সেই ছায়া। মাটি থেকে দুই হাত উপরে ভাসছে।


ওর মুখ থেকে বের হলো একটা নাম, "রাশেদ..."


রাশেদ বেরিয়ে এলো। বললো, "আবদুল, তুই শান্ত হ। আমরা মুক্তি চাই।"


শ্বেত পাগলা হাত বাড়ালো। রাশেদের বুকের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিলো। রাশেদ একটা শব্দও করলো না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "দাদাকে বলো, আমি মাফ করে দিয়েছি।"


তারপর রাশেদের শরীর ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গেল।


এবার শ্বেত পাগলা আমার দিকে তাকালো। আমি দৌড়াতে পারছিলাম না। গলা শুকিয়ে কাঠ।


ঠিক তখন দাদার ঘর থেকে একটা আলো বের হলো। দাদা দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে কুরআন শরীফ।


তিনি বললেন, "আবদুল, তোর সময় শেষ। ৫০ বছর হয়ে গেছে।"


শ্বেত পাগলা চিৎকার করে উঠলো। বটগাছটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। ছায়াটা চিৎকার করতে মাটির নিচে ঢুকে গেল।


দাদা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "যা রাকিব। লিখে রাখ। মানুষ যেন জানে। আর গাছটা কাটিস না।"


পরদিন সকালে সব স্বাভাবিক। বটগাছটা আগের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চাচা কিছুই মনে করতে পারছেন না। গ্রামের লোকে বলে, আমি নাকি জ্বরে বকছিলাম।


কিন্তু আমার পকেটে আছে দাদার ডায়েরি। আর হাতে আছে রাশেদের দেওয়া একটা মাটির পুতুল। পুতুলটার বুকে লেখা, "১৪-১২-১৯৭১"।


আমি ঢাকায় ফিরে এসেছি। কিন্তু রাতে ঘুমাতে পারি না। কারণ মাঝে মাঝে শুনি ফোনে একটা বাচ্চা ছেলের কান্না।


কেউ বলে, ওটা নেটওয়ার্কের সমস্যা।


আমি জানি, ওটা রাশেদ। ও এখনো শান্তি পায়নি।


কুমিল্লার বুড়িচংয়ের রামনগর গ্রামে গেলে জিজ্ঞেস কোরো গোমতীর বাঁধের কথা। বুড়োরা বলবে, "ওইদিকে যাইও না বাবা। শ্বেত পাগলা আছে।"


কিন্তু কেউ বলবে না কেন আছে। কারণ সত্যি কথা বললে, শ্বেত পাগলা শুনতে পায়।


আর শুনলে, ও আসে।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চারুলতার জীবনের ভয়ানক এক রাত

মরুভূমির বিয়ের রাত