আয়নার পেছনের হাসি*
আয়নার পেছনের হাসি*
গ্রামের নাম ছিল ধলাপাড়া। নামের সাথে মিল নেই, কারণ এখানে রাত নামলেই চারদিক কালো হয়ে যেত, যেন কেউ কালি ঢেলে দিয়েছে।
আমি রাফি। শহর থেকে ফিরেছি দাদার শ্রাদ্ধের পরে। পুরনো দোতলা বাড়িটা এখন আমার। কেউ থাকে না। শুধু আমি আর দেয়ালে ঝুলে থাকা একটা বড় আয়না। আয়নাটা দাদার। বলে গেছিল, "এটা বেচিস না রে। এটায় তোর মা হাসে।"
মা মারা গেছে আমি যখন দশ বছরের। তখন থেকে আয়নায় মাকে দেখি না। শুধু নিজের মুখ দেখি। কেমন ফ্যাকাসে।
প্রথম রাতে কিছু হয়নি। দ্বিতীয় রাতে শুনলাম আয়নার পেছন থেকে খিলখিল হাসি। মেয়েলি হাসি। প্রথমে ভাবলাম বিড়াল। উঠে দেখলাম, কেউ নেই। আয়নায় শুধু আমি। কিন্তু হাসিটা থামে না।
তৃতীয় রাতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কে তুমি?"
আয়নায় আমার ঠোঁট নড়ল না, কিন্তু উত্তর এলো, "আমি তোর মা রে।"
বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কষ্ট। দশ বছর পর মায়ের গলা শোনা। কিন্তু গলাটা কেমন ভেজা। কান্নার মতো।
"তুমি কই মা? আমি তোমায় দেখতে পাচ্ছি না।"
"আয়নার পেছনে রে। তুই ডাকলি, তাই আসলাম। কিন্তু বের হতে পারি না। ওরা আটকে রেখেছে।"
"কে আটকেছে?"
আয়নাটা ঝাপসা হয়ে গেল। তারপর ভেসে উঠল একটা মুখ। আমার না। একটা বুড়ি। চোখ দুটো নেই, শুধু গর্ত। সেই গর্ত দিয়ে রক্ত পড়ছে।
আমি চিৎকার করে পেছনে সরে গেলাম। আয়না ফেটে গেল টুং করে।
পরদিন সকালে গ্রামের বুড়ো কালু চাচা এলো। বলল, "দাদা তোরে বারণ করছিল না আয়নাটা ধরতে?"
"কেন? কী আছে এটায়?"
কালু চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "তোর মা পাগল হয়ে মরছিল রে। তোর জন্মের সময় অনেক রক্তক্ষরণ হইছিল। ডাক্তার ছিল না। দাদা পাগল হয়ে গেছিল। তারপর এক ওঝা আইলো। কইল, আত্মারে আটকায় রাখলে শান্তি পাবে। তাই আয়নায় বন্দি করছিল তোর মারে।"
রাগে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। "মানে? মারে আটকায় রাখছে? শান্তির নামে জেল?"
"ওঝা কইছিল, না করলে আত্মা সবাইরে নিয়া যাবে। তোর মা খুব রাগী ছিল মইরা যাওয়ার পর।"
সেদিন রাতে আবার হাসি। এবার কান্না মেশানো।
"রাফি... তুই আমারে ছাড়া... প্লিজ..."
আমার অভিমান হলো। দশ বছর। একটা বারও স্বপ্নে আসোনি। এখন কষ্টে মরতেছি বলে মনে পড়ল?
"তুমি এতদিন কই ছিলা মা? আমি একা বড় হইছি। স্কুলে কেউ মা দিবসে কার্ড দিলে আমি বাথরুমে গিয়া কাঁদছি। তুমি দেখছো?"
আয়নার পেছন থেকে শুধু ফোঁপানি আসে।
আমি বললাম, "ছাড়ব না তোমারে। আমি তোমারে বের করব।"
কীভাবে বের করব জানি না। ওঝা মারা গেছে বিশ বছর আগে। তার নাতি আছে, নাম শফিক। শহরে থাকে। পরদিন সকালে গেলাম ওর কাছে।
শফিক বলল, "বন্দি আত্মা ছাড়া যায়। কিন্তু বিনিময় লাগে।"
"কী বিনিময়?"
"যে ছাড়াবে, তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা।"
আমার প্রিয় জিনিস? আমার তো কেউ নেই। ফোনের গ্যালারিতে মায়ের একটা ছবি আছে। সেটাই।
"দিয়ে দেব।"
রাত বারোটায় আবার বাড়ি ফিরলাম। শফিকের দেওয়া মন্ত্র, কালো মোমবাতি, লাল সুতো। সব রেডি।
মন্ত্র পড়তে শুরু করলাম। আয়নাটা কাঁপতে লাগল। ভেতর থেকে মা চিৎকার করছে।
"না রাফি! করিস না! ও মিথ্যা বলে!"
কিন্তু আমি থামলাম না। কষ্ট, রাগ, অভিমান সব মিলে একটা জেদ হয়ে গেছে।
শেষ মন্ত্রটা পড়তেই আয়নাটা ফেটে গেল চুরমার হয়ে। ভেতর থেকে একটা সাদা ছায়া বের হয়ে এলো। মায়ের মতো দেখতে। কিন্তু চোখ দুটো কালো। মুখে সেই খিলখিল হাসি।
"বের হইছি রে বাবা। অবশেষে বের হইছি।"
আমি দৌড়ে জড়িয়ে ধরতে গেলাম।
ঠিক তখন শফিক ফোন দিল। "রাফি, ভুল করছিস। ওটা তোর মা না। ওটা ছায়া খেকো। আয়নায় বন্দি ছিল। ও মানুষের কষ্ট খায়। তোর মায়ের রূপ নিয়ে তোরে ভুলাইছে।"
আমার হাত থেমে গেল। ছায়াটা আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করল, "তোর কষ্টটা অনেক মিষ্টি রে। দশ বছর ধরে খাইতেছি।"
আমি পেছনে সরে গেলাম। রাগে শরীর কাঁপছে। "তুই আমার মা না?"
ছায়াটা হেসে উঠল। এবার সেই হাসি ভয়ানক। "না রে। তোর মা তো মইরাই গেছে। আমি শুধু ওর রূপ নিছিলাম। তোর অভিমান, তোর কান্না, সব খাইছি।"
আমার মাথায় একটাই চিন্তা এলো। মা সত্যি কথা বলছিল। ও আমারে বারণ করছিল।
আমি ছুটে গিয়ে পড়ে থাকা আয়নার টুকরো তুললাম। শফিক বলছিল, আটকাতে হলে আবার আয়নায় ফেরাতে হয়।
ছায়াটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি চিৎকার করে টুকরোটা ছুড়ে মারলাম।
"মা, যদি শুনতে পাও... ক্ষমা করো। আমি ভুল করছি।"
আশ্চর্য। আয়নার টুকরোতে মায়ের মুখ ভেসে উঠল। শান্ত। হাসি মুখে।
"ভালো থাকিস বাবা। আর কাঁদিস না।"
ছায়াটা চিৎকার করে আয়নার টুকরোর ভেতরে ঢুকে গেল। আয়নাটা নিজে নিজেই জোড়া লেগে গেল। আগের মতো।
সব চুপ।
পরদিন সকালে উঠে দেখি আয়নায় আমি না, একটা বাচ্চা মেয়ে হাসছে। আমার ছোটবেলার মতো।
আমি বুঝলাম, মা মুক্তি পেয়েছে।
এখন আর রাতে হাসি আসে না। আসে শুধু ঘুম। শান্তির ঘুম।
কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, আয়নার পেছন থেকে কেউ ফিসফিস করে বলে, "ভালো থাকিস রে।"
আমি হাসি। কষ্টের হাসি না। শান্তির হাসি।
আর অভিমান নেই। রাগ নেই। শুধু আছে একটা কথা—
মা, তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। আমি ভালো আছি।
---
মন্তব্যসমূহ