পরক্রিয়া প্রেমের শেষ পরিনতি
পরক্রিয়া প্রেমের শেষ পরিনতি
চরপাড়া গ্রামটা পদ্মার বুকে একটা ফোঁটা। চারপাশে ধানক্ষেত, মাঝখানে কাঁচা রাস্তা। রাত হলেই নদীর হাওয়ায় বাঁশের বন শনশন করে। বুড়োরা বলে, এই শনশন আওয়াজ মানুষের না, ডাঙায় উঠে আসা কিছু একটার নিঃশ্বাস।
সুমন সেই গ্রামে আসে পাঁচ বছর আগে। কফিলের জমিতে দিনমজুর। গায়ের রং পোড়া, হাত শক্ত। দিনে মাঠে খাটে, রাতে নদীর ঘাটে বসে বাঁশি বাজায়। বাঁশিটা বাপের রেখে যাওয়া। বাপ মারা যাওয়ার পর আর কেউ সুর শেখায়নি। সুমন নিজে নিজে বাজায়। বেসুরো, তবু বাজায়। কারণ বাজালে পদ্মার অন্ধকারটা একটু কম কালো লাগে।
নীলু মাতবরের ছোট মেয়ে। বয়স আঠারো। চোখ দুটো বড়, আর ভয় কম। মাতবর তিন মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে শহরে। নীলুকে ঘরে বন্দি করে রেখেছে। কারণ নীলু দেখতে একটু বেশি সুন্দর। আর সুন্দর মেয়ে মানে গ্রামে বিপদ।
প্রথম দেখা হয় বর্ষার এক বিকেলে। পদ্মা ফুলে উঠেছে। ঘাটে পানি। সুমন বাঁশি বাজাচ্ছে। নীলু ছাদে কাপড় শুকাতে গিয়ে শুনতে পেল। সুরটা কেমন জানি টান দিল বুকের ভেতর। পরদিন আবার গেল। তারপর প্রতিদিন।
কেউ কাউকে নাম বলেনি। শুধু চোখে কথা। সুমন বাঁশি থামিয়ে তাকায়। নীলু একটু হাসে। ব্যস। এই হাসিটাই সুমনের সাতদিনের খাটুনির দাম হয়ে গেল।
মাস খানেক পর এক সন্ধ্যায় নদীর পানি কমে গেছে। কাঁঠাল গাছের আড়ালে প্রথমবার কথা হলো।
“তোমার নাম?” নীলু ফিসফিস করে।
“সুমন। তোমার?”
“নীলু। আর এখানে আসবা না। বাপ জানলে কেটে নদীতে ভাসাবে।”
সুমন হাসল। “তাহলে কাটুক।”
নীলু ভয় পেল। কিন্তু চোখ সরালো না।
তারপর থেকে প্রতিরাত। যখন গ্রাম ঘুমায়, তখন দুটো মানুষ জেগে থাকে। কোনো স্পর্শ না। কোনো প্রতিশ্রুতি না। শুধু কথা। কে কোথায় জন্মেছে, কে কী খেতে ভালোবাসে, কে রাতে স্বপ্নে কী দেখে। সুমন বলে, সে স্বপ্নে নদী পার হয়। নীলু বলে, সে স্বপ্নে বাঁশির সুর শোনে।
গ্রামে প্রেম লুকিয়ে রাখা যায় না। কুকুরও বুঝে যায় কোন গন্ধ নতুন। মাতবরের কানে খবর গেল দশ দিনের মাথায়।
সেদিন সন্ধ্যায় নীলুকে ঘরে ডেকে দরজা বন্ধ করলো মাতবর। হাতে বাঁশের লাঠি।
“পরের ছেলের সাথে প্রেম? আমার জাত যাবে, জাত। কাল থেকে তুই এই ঘরের চৌকাঠ পার হবি না। পার হলে লাঠির একটা বারিও মাটিতে পড়বে না।”
নীলু কিছু বলল না। শুধু ঠোঁট কামড়ে ধরলো। রক্ত বের হলো।
মাতবর লোক পাঠালো সুমনের টিনের ঘরে। বলল, “কাল ভোরে চর ছেড়ে চলে যাবি। না গেলে তোর দুই পা ভেঙে পদ্মায় ভাসাবো। চরের মাটি তোর জন্য না।”
সুমন মাথা নিচু করে শুনলো। কিছু বলল না। রাতে ঘাটে গিয়ে বাঁশি বাজালো। সুরটা আজ অন্যরকম। ভাঙা। কান্নার মতো।
নীলু ঘরের জানালা দিয়ে শুনলো। বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। মনে হলো, এই সুরটা শেষবার।
ভোর হওয়ার আগেই সুমন চলে গেল। কেউ দেখেনি। শুধু ঘাটে পড়ে রইলো বাঁশিটা। ভেজা বালিতে অর্ধেক ডোবা।
নীলুকে তিনদিন ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হলো না। চতুর্থ দিন খবর এলো, শহরের এক ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্র ধনী। গাড়ি আছে। মাতবর খুশি।
বিয়ের দিন সকাল। নীলু কনের সাজে। কিন্তু চোখে পানি। চুপিচুপি ঘাটে গেল। কেউ নেই। শুধু বাঁশিটা পড়ে আছে।
নীলু বাঁশিটা হাতে নিল। ঠান্ডা। ভেজা। কানের কাছে নিয়ে ফুঁ দিল। আওয়াজ হলো না। ফুটোয় বালি জমে গেছে।
নদীর দিকে তাকালো। পানি কালো। নিচে কী আছে কেউ জানে না। বুড়োরা বলে, পদ্মার তলায় একটা গ্রাম ডুবে আছে। যে রাতে চাঁদ ওঠে না, সেই রাতে সেই গ্রামের মানুষ ডাঙায় ওঠে।
নীলু বাঁশিটা ছুঁড়ে দিল নদীতে। বাঁশিটা ঘুরে ঘুরে ভাসতে লাগলো। তারপর আস্তে আস্তে ডুবে গেল।
বিয়ের পর নীলু শহরে চলে গেল। শ্বশুরবাড়ি বড়। এসি আছে। গাড়ি আছে। কিন্তু রাতে ঘুম হয় না। কারণ প্রতিরাতে স্বপ্নে নদীর ঘাট দেখে। আর ঘাটে বসে কেউ বাঁশি বাজায়। বেসুরো।
ছয় মাস পর খবর এলো, মাতবর মারা গেছে। পানিতে ডুবে।
নীলু গ্রামে ফিরলো। শ্রাদ্ধের কাজ। রাতে একা ঘাটে গেল। বাপকে শেষবার দেখতে।
চাঁদ নেই। চারদিক ঘুটঘুটে। নদীর পানি ফুলে উঠেছে। হঠাৎ পানির ভেতর থেকে আওয়াজ এলো। টু... টু... টু...
বাঁশির সুর। সেই বেসুরো সুর।
নীলুর বুক ধক করে উঠলো। পানির দিকে এগোলো।
পানির ওপর কিছু একটা ভাসছে। কাছাকাছি এলে বোঝা গেল, বাঁশি। সেই বাঁশি। ছয় মাস পানিতে ডুবে থেকেও পচেনি। বরং আরও চকচকে হয়েছে।
নীলু হাত বাড়ালো। বাঁশিটা ধরার সাথে সাথে পানির নিচ থেকে হাত উঠে এলো। ঠান্ডা। নীলচে। হাতে মাটি লেগে আছে।
সুমন।
চোখ দুটো খোলা। কিন্তু পুতুলের মতো। পেট ফোলা। গায়ে শ্যাওলা। মুখে সেই হাসি। যে হাসি নীলুকে প্রথমদিন দেখিয়েছিল।
“তুমি ফিরে এলে?” সুমন বলল। গলা দিয়ে পানি পড়ছে।
নীলু পিছিয়ে যেতে চাইলো। পারলো না। পা বালিতে আটকে গেছে।
“আমি বলেছিলাম, কাটুক। তুমি কাটলে না। আমি নিজেই কেটে গেলাম।” সুমনের গলা ভারী। “মাতবর আমাকে মারে নাই নীলু। আমি নিজেই নদীতে নেমেছিলাম। তোমার বাঁশির সুর শুনতে। ভেবেছিলাম, তুমি এলে আমি বাজাবো।”
নীলু কাঁপছে। “তুমি মরে গেছো সুমন।”
“মরে গেছি তো কী হয়েছে? প্রেম মরে না নীলু। পরক্রিয়া প্রেম আরও মরে না। গ্রাম, জাত, মাতবর—সব মরে যায়। প্রেম থাকে। নদী সাক্ষী।”
সুমন নীলুর হাত ধরলো। হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। নীলুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
“চলো নীলু। শহরের গাড়ি, এসি, শাড়ি—সব মিথ্যা। এখানে শুধু আমরা। নদী, বাঁশি আর অন্ধকার। চিরকাল।”
নীলু চিৎকার করতে চাইলো। গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না। পানির নিচ থেকে আরও হাত উঠে আসছে। সব হাত ঠান্ডা। সব হাতে মাটি।
পরদিন সকালে গ্রামের লোক ঘাটে নীলুর লাশ পেল। গায়ে কনের শাড়ি। মুখে হাসি। হাতে একটা বাঁশি। ভেজা। চকচকে।
মাতবরের শ্রাদ্ধ হলো। নীলুর শ্রাদ্ধও হলো। গ্রামে কথা ছড়ালো, পরক্রিয়া প্রেম করলে পদ্মা ছাড়ে না।
তারপর থেকে প্রতি অমাবস্যার রাতে ঘাটে বাঁশির সুর শোনা যায়। বেসুরো। ভাঙা। কান্নার মতো।
যারা শোনে, তারা বলে, নদীর পানিতে দুটো ছায়া দেখা যায়। একটা লম্বা। একটা ছোট। হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর নড়ছে না।
পরক্রিয়া প্রেমের শেষ পরিনতি এটাই। নিয়ম মারে না। সমাজ মারে না। মারে শুধু সেই সুর, যে সুর একবার বাজলে আর থামে না।
*শেষ*
--- "
মন্তব্যসমূহ