*শালবনের ডাক
*শালবনের ডাক*
*স্থান: কুমিল্লা, ময়নামতি শালবন বিহার*
২০২৬ সালের শীত। ঢাকা ইউনিভার্সিটির আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের তিনজন ছাত্র — রাফি, তন্বী আর সজীব — ময়নামতিতে এক্সক্যাভেশনের কাজে এসেছে। কুমিল্লা শহর থেকে সিএনজি নিয়ে শালবন বিহারে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। কেয়ারটেকার কাশেম চাচা সাবধান করে দিলেন, “বাবারা, রাত ১০টার পর বিহারের ভেতর যাইয়ো না। পুরান আমলের কথা, কিন্তু এইখানে রাইতে ‘চারুলতা’ ঘুরে।”
চারুলতা? নাম শুনে তন্বী হেসে ফেলল। “চাচা, আপনারা এইসব কুসংস্কার এখনো মানেন?”
রাত ১১টা। ক্যাম্পের তাঁবুতে শুয়ে রাফির ঘুম আসছিল না। হঠাৎ শুনল, দূরে শালবনের ভেতর থেকে কেউ ডাকছে — “রাফি... এই রাফি... একটু শুনবা?” গলাটা মেয়েলি, কান্না মেশানো। বুকটা ধক করে উঠল। গলাটা চেনা চেনা লাগছে। এটা তো... এটা তো ওর ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া ফুপাতো বোন চারুর গলা!
রাফি টর্চ নিয়ে তাঁবু থেকে বের হলো। কুয়াশায় ঢাকা শালবন। ১২০০ বছর পুরনো ইটের স্তূপগুলো অন্ধকারে দানবের মতো লাগছে। “কে? চারু নাকি?” রাফি ডাক দিল।
“এইদিকে আয়, ভাই। আমি কূপের ভিতর পইড়া গেছি,” আওয়াজটা এবার স্পষ্ট বিহারের পেছনের পরিত্যক্ত কূপ থেকে আসছে।
রাফি দৌড়ে গেল। কূপের পাড়ে দাঁড়াতেই দেখল, নিচে সাদা শাড়ি পরা এক মেয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে। চাঁদের আলোয় মুখটা দেখা যাচ্ছে না। “হাতটা দাও, তুলতেছি,” রাফি হাত বাড়াল।
মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসি মানুষের না। “হাত দিবি? ১৯৭১ সালে পাক মিলিটারি যখন আমারে এই কূপে ফালাইছিল, তখন কই ছিলি তোর হাত?”
রাফির রক্ত হিম হয়ে গেল। কাশেম চাচা সকালে বলেছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বিহারের কূপে অনেক মেয়েকে... ছিঃ!
মুহূর্তে মেয়েটা কূপ বেয়ে উঠে এলো। পা নেই, বাতাসে ভাসছে। চোখের কোটর শূন্য, সেখান থেকে টপটপ করে কালো রক্ত পড়ছে। “তোরা শহর থেকে আসছস, ইতিহাস খুঁড়তে। আমার ইতিহাস কে খুঁড়ব?”
রাফি দৌড় দিতে গিয়ে উল্টে পড়ল। জ্ঞান হারানোর আগে শেষ শুনল, “প্রতি অমাবস্যায় আমি একজনকে ডাকি। এইবার তোর পালা...”
পরদিন সকালে তন্বী আর সজীব রাফিকে অজ্ঞান অবস্থায় কূপের পাশে পায়। রাফি এখন কুমিল্লা মেডিকেলে ভর্তি। ডাক্তার বলছে, প্রচণ্ড ভয় থেকে নার্ভাস ব্রেকডাউন। কিন্তু রাফি ঘুমের মধ্যে এখনো বিড়বিড় করে, “চারু ডাকতেছে... কূপের ভিতর থেকে... আমাকে যাইতে হবে...”
কাশেম চাচা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “কইছিলাম, রাইতে বিহারে যাইয়ো না। চারুলতা যারে একবার নাম ধইরা ডাকে, হের আর নিস্তার নাই।”
আজ অমাবস্যা। কুমিল্লার শালবনে আবার কেউ ফিসফিস করে ডাকছে... “এই... শুনছো?”
---
*শেষ।*
মন্তব্যসমূহ